web analytics
Technology

মুরের নীতির শেষ সীমা এবং ইলেকট্রনিক্সের ভবিষ্যৎ

মুরের নীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর ইন্টেগ্রেটেড সার্কিটে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে এবং সেই সাথে কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতাও দ্বিগুণ হবে প্রতি দুই বছরে।[1],[2] Intel Corporation এর অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুরের দেয়া এই নীতি এখন পর্যন্ত ভালভাবেই কাজ করছে। ১৯৭০ সালে Intel এর বানানো Intel 4004 মাইক্রোপ্রোসেসরে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার মত। এখন যদি  Intel Core i7 প্রসেসরের কথা যদি বলি, এর মাত্র 42.5mm x 45mm ক্ষেত্রফলের প্যাকেজে ট্রানজিস্টর আছে ৭৩১ মিলিয়ন! আর কম্পিউটিং স্পিডও বেড়েছে সেই হারে। 740 kHz থেকে হয়ে দাঁড়িয়েছে 3GHz।[3]

সময়ের সাথে ট্রানজিস্টর গণনা বৃদ্ধি গ্রাফ-চিত্র

কিন্তু একবার ভাবেন, এভাবে আর কতদিন চলতে পারে? বিজ্ঞানীরা এট্টুখানি জায়গায় ট্রানজিস্টর জড় করতে করতে যা করে ফেলেছে তার তো একটা সীমা আছে! গর্ডন মুরের মতেও তার নীতি মোটামুটি ২০২৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এরপর আর হয়তো সাধারণ পদ্ধতিতে কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা বছর বছর বাড়তে থাকবে না। এর বৃদ্ধি এক্সপনেনশিয়াল হয়ে যাবে। এর কারণ কী? কোন ব্যাপারটা এই সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে? এটা বোঝার জন্য আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে।

একটু আগে যে Core i7 প্রসেসরের কথা বললাম সেখানে ট্রানজিস্টরের দৈর্ঘ্য ৪৫ ন্যানোমিটার। তবে 8th Generation এর Core i7 এর প্রসেসরের কাছে এটা খুবই বড়। 8th Generation Core i7 প্রসেসরে এটা মাত্র ১৪ ন্যানোমিটার।[4] ইন্টেগ্রেটেড সার্কিটে যতই ট্রানজিস্টরের ঘনত্ব বাড়ানোর দরকার পড়ছে এর আকৃতিও তত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করতে হচ্ছে। কিন্তু ট্রানজিস্টরের এই ক্ষুদ্রকরণে একটা সমস্যা আছে। কম্পিউটার মাইক্রোপ্রসেসরে যে ট্রানজিস্টর ব্যবহার করা হয় সেখানে ড্রেন, গেট আর সোর্স নামের তিনটি টার্মিনাল থাকে। এখানে গেটের কাজ হচ্ছে সোর্স টার্মিনাল থেকে ড্রেন টার্মিনালে ইলেকট্রনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই একে অন-অফ সুইচ হিসেবে কাজে লাগিয়ে লজিকাল অপারেশন করা যায়।

ট্রানজিস্টর ডায়াগ্রাম

এখন ট্রানজিস্টরের আকৃতি যত ক্ষুদ্র হয় ড্রেন আর সোর্সের মধ্যে দূরত্ব ততই কমতে থাকে। আর এখানেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স একটা ঝামেলার সৃষ্টি করে। কারণ ইলেকট্রনের মত ক্ষুদ্রকণা টানেলিং করতে পারে। অর্থাৎ আপনি গেট দিয়ে যতই বিভব প্রচীর তৈরি করেন না কেন, ইলেকট্রনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে সোর্স থেকে টানেলিং করে ড্রেনে যাওয়ার। অর্থাৎ এই ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম সিস্টেমে গেটের উপর আমাদের আর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

এটা অনেকটা পানির ট্যাপ বন্ধ করার পরও ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার মত। বাসা-বাড়ির ক্ষেত্রে এটা পানির অপচয় আর কম্পিউটারের ক্ষেত্রে লজিকের গন্ডগোল! কারণ কোটি কোটি ট্রানজিস্টরের সজ্জায় ডিজাইন করা সার্কিট দিয়ে লজিকাল অপারেশন করা হয়। এখন কোয়ান্টাম টানেলিং-এর ফলে ট্রানজিস্টরগুলো ইচ্ছামত অন-অফ হতে থাকলে তো বিপদ!

এই কারণে ট্রানজিস্টরের আকৃতি যত ছোট হচ্ছে মুরের নীতি কার্যকর থাকার দিনও ফুরিয়ে আসছে।

কিন্তু বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়াররা থেমে নেই। এরকম সমস্যার কথা মাথায় রেখেই তারা বিভিন্ন আইডিয়া বের করার চেষ্টা করছে যাতে কম্পিউটিং স্পিড ভবিষ্যতে আরও শতগুণ বৃদ্ধি করা যায়। সেইরকম কিছু আইডিয়া নিয়ে এখনই কাজ চলছে। এরকম কিছু আইডিয়ার কথা এখানে আলোচনা করা হল।

ট্রানজিস্টর লেজারঃ

নিক হলোনিয়াক এবং মিল্টন ফেঙ ট্রানজিস্টর লেজার আবিষ্কার করেন ২০০৪ সালে। এই নতুন ধরনের উপাদান নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে।

ইলেকট্রনিক্স শিল্পের বিপ্লব হল কম্পিউটার। আর কম্পিউটার শিল্পের বিপ্লব ঘটেছে ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর। মাইক্রোপ্রসেসরে ট্রানজিস্টরের কাজ সুইচিং করা। অর্থাৎ সুবিধামত on বা off করে লজিকাল অপারেশন করা। ট্রানজিস্টর এমন একটি যন্ত্রাংশ যা ইনপুটে দেয়া সিগনালের শক্তি না কমিয়েই আউটপুট দিতে পারে। এটা দিয়ে সুইচিং-এর কাজটাও দ্রুত করা যায়।

কিন্তু সাধারণত ট্রানজিস্টর এইসব কাজ করে ইলেকট্রিকাল সিগনাল দ্বারা। ইলেকট্রিকাল সিগনাল মানেই ইলেকট্রনের প্রবাহ। আর আমাদের মাথায় রাখতে হবে ইলেকট্রনের একটা নির্দিষ্ট গতিবেগ আছে। কিন্তু কোনোভাবেই সেই গতিবেগ আলোর কণা ফোটনের ধারে কাছেও না। তো আমরা যদি ফোটন দিয়েই সিগনালিং-এর কাজ করতে পারি তাহলে?

ট্রানজিস্টর লেজার ইলেকট্রিকাল সিগনাল ইনপুট নিয়ে আউটপুটে ইলেকট্রিকাল এবং অপটিকাল দুই রকমের সিগনালই দিতে পারে।[5] এর মানে, একই সাথে ইলেকট্রন ও ফোটন দিয়ে সিগনালিং-এর কাজ করা সম্ভব। তাই গবেষকরা মনে করছে এই কম্পোনেন্ট হয়তো কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারবে।

সিলিকন ফোটোনিকস (silicon photonics):

মূলত কম্পিউটার শিল্প সব থেকে বেশি এগিয়েছে সিলিকনের মত উপাদান দিয়ে ট্রানজিস্টর বানানোর উপায় পাওয়ার ফলেই। সিলিকন হল বালির উপাদান। তাই এই জিনিষ প্রকৃতিতে কি পরিমাণে আছে তা আর বলা লাগে না। ফোটোনিকস হল আলোরকণা ফোটনের নির্গমন, সঞ্চালন এবং নিয়ন্ত্রণ করার বিজ্ঞান। একটু আগে ট্রানজিস্টর লেজারের অপটিকাল সিগনালের কথা বললাম তা ফোটোনিকসের আওতায় পড়ে।

সিলিকনের যেসব অপটিকাল বৈশিষ্ট্য আছে তা ব্যবহার করে কম্পিউটিং প্রসেসরের গতি বৃদ্ধি অব্যহত রাখার কথা ভাবছে ইঞ্জিনিয়াররা।

ভাইল ফার্মিয়ন (Weyl fermions):
এটা একেবারে ভিন্ন রকমের আইডিয়া। এটা বাস্তবায়ন করা গেলে ইলেকট্রনিক্সের সীমাবদ্ধতা নয় শুধু, ইলেকট্রনিক্সের প্রতিস্থাপনও হতে পারে।

৮৯ বছর আগে ১৯২৯ সালে হারম্যান ভাইল এমন এক কণার অস্তিত্বের কথা প্রস্তাব করেছিলেন যার চার্জ আছে কিন্তু ভর নেই। এই কণা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে। এই কারণে বিজ্ঞানীর নাম অনুসারে এর নাম ভাইল ফার্মিয়ন।

বহুবছর পর ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক প্রথমবারের মত এই কণার খোঁজ পায় এবং এর  নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসান।[6]

বিজ্ঞানী জাহিদ হাসান এবং তার গবেষণা দল

ভাইল ফার্মিয়ন যেহেতু ভরহীন কণা তাই এর পরিবহনের গতিও ইলেকট্রনের চেয়ে বেশি। তাই ভাইল ফার্মিয়ন কাজে লাগানো গেলে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতির গতি অসম্ভব রকম বেড়ে যেতে পারে। সেই সাথে বাড়তে পারে কম্পিউটিং-এর গতি। গবেষকরা এই ধরনের ইলেকট্রনিক্সের নাম রেখেছে ভাইলট্রনিক্স। বিজ্ঞানীরা আশা করছে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর ক্ষেত্রেও এই কণার ভূমিকা থাকবে।[7]

তবে এখনই এটা সম্ভব হবে না। কারণ সেক্ষেত্রে নতুন ম্যাটেরিয়াল দ্বারা তৈরি ডায়োড, ট্রানজিস্টর ইত্যাদির উদ্ভাবন প্রয়োজন। আরও বেশি প্রয়োজন সিলিকন বা এর মত কোনো সহজলভ্য ম্যাটেরিয়াল যেখানে ফার্মি কণা পরিবহনের মত দশা তৈরি করা যাবে।

১৯৬৯ সালে চাঁদে পা রাখার জন্য NASA-র এপোলো-১১ মিশনে যে কম্পিউটার ব্যবহার করার হয়েছিল তার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী স্মার্টফোন পকেটে নিয়ে আমরা এখন ঘুরে বেড়াই। ভবিষ্যতে আমাদের হাতে, আমাদের পকেটে আরও কত শক্তিশালী গ্যাজেট আসে তার জন্য গবেষক এবং ইঞ্জিনিয়াররাই ভরসা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close