web analytics
Lifestyle

বছরে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার সিজার, ক্ষতি ৪ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশে বছরে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার সিজারিয়ান বেবি হয়ে থাকে যা, অপ্রয়োজনীয়। এটা মোট সিজারিয়ান বেবির ৩১ শতাংশ। এতে করে বছরে ক্ষতি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার ৫৭ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বেবি বেশি জন্মে থাকে বেসরকারি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে। এটা হয়ে থাকে ডাক্তার, নার্স এবং সর্বোপরি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকের মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থে। সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ ওখানে সিজার করা হলে ডাক্তার অথবা নার্স কারোরই আর্থিক সুবিধা নেই। ফলে সিজার করার তাড়াহুড়াও নেই সরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসকরো বলছেন, ‘স্বাভাবিক ডেলিভারির সুবিধা বেশি। খরচ কম পড়ে, জটিলতা থাকে না বললেই চলে। সর্বোপরি স্বাভাবিক ডেলিভারিতে জন্ম নেয়া শিশু রোগ-ব্যাধি কম।’ সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে স্বাভাবিক জন্ম নেয়া শিশু সিজারিয়ান শিশুর চেয়ে বেশি স্মার্ট হয়ে থাকে, বুদ্ধি বেশি থাকে।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর ড. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়াই কিছু সিজারিয়ান হয়ে থাকে প্রধানত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, মায়েদের ইচ্ছায়। আবার কিভাবে একটু জটিল অবস্থা থেকে সিজার না করে স্বাভাবিক জন্ম দিতে মাকে সহায়তা করা যায় তা চিকিৎসকের জানা না থাকার কারণেও সিজার করা হয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় সিজার করার কারণে শারীরিক অথবা মানসিক কষ্টের সাথে অনেক আর্থিক ক্ষতিও হয়ে থাকে মানুষের। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান করার কারণে বছরে মানুষের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের (প্রায় চার হাজার ৫৭ কোটি টাকা)।’ ড. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় সিজার করা হলে শিশু এবং মায়ের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।’

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সম্বন্ধে ড. ইশতিয়াক মান্নান আরো বলেন, এ অনভিপ্রেত সিজারের ১৬ শতাংশ হয়ে থাকে সরকারি হাসপাতালে এবং অবশিষ্ট ৮৪ শতাংশ হয়ে থাকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।

অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধ করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক বলেন, ‘প্রয়োজন না থাকলেও ব্যক্তি বিশেষের সুবিধার জন্য এবং আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য সিজার করা কারো কাম্য হতে পারে না। এতে করে ব্যক্তি বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকতে পারে তবে সারাজীবন মা ও শিশুকে যন্ত্রণা সহ্য করে থাকতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘এই অনৈতিক কাজ বন্ধ করতে হবে এবং এটা বন্ধ করতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে আগে। এ ব্যাপারে বিএমডিসি বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে।’ অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে অবশ্য সিজারিয়ান নিয়ে কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে তা দূর করতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।’ তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন সিজারিয়ান নিরাপদ। এতে মায়ের ঝুঁকি কমে যায় এবং শিশুর জন্ম দ্রুত হয়। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। এ ধারণা দূর করার জন্য চিকিৎসকদের দায়িত্ব আছে। মায়েদের প্রসবপূর্ব সেবা দেয়ার সময়ই মাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। মাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে সিজার করা ভালো নয়। এটা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।’ এ ব্যাপারে অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, আগে থেকে গর্ভবতী মা ও তার স্বামী অথবা আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করতে হবে যে, কোন হাসপাতালে বাধ্য না হলে সিজার করে না। সেখানে যেকোনো প্রকারেই হোক, যেতে হবে। আবার কোনো কোনো প্রাইভেট চেম্বারের চিকিৎসকও আছেন যারা সব সময় নৈতিকভাবে ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ করে থাকেন। তাদের কাছে যেতে হবে এবং তাদের পরামর্শ নিতে হবে।

উল্লেখ্য, মা ও সন্তানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করার জন্য সম্প্রতি চিকিৎসকেরা জন্মের পরই শিশুকে মায়ের কোলে তুলে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। মায়ের বুকের সাথে শিশুকে চেপে ধরে মায়ের শরীরের উষ্ণতা প্রদানের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এতে করে শিশুর সাথে মায়ের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং অসুস্থ শিশুও দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক ইউনিটে মা ও শিশুদের এ ধরনের শুশ্রƒষা দেয়ার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিটিকে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ বলা হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close