web analytics
Economy

টাকার মান কমানো হবে না: অর্থমন্ত্রী

টাকার মান ডলারের বিপরীতে কমানো হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, আমরা প্রয়োজনে ভিন্ন খাতকে প্রণোদনা দিবো। তবে তারপরও আমরা টাকার মান কমাবো না। কারণ বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর। তাই টাকার মান কমালে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। 

বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। 

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই চেয়েছিলো যে আমাদের কারেন্সি ডিভাল্যুশন (টাকার মান ডলারের বিপরীতে কমানো) করা হোক। তাদের যুক্তি ছিল কারেন্সি ডিভাল্যু হলে রফতানি বাণিজ্য থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে যাবে। ফলে আমরা বলেছি অন্য যেসব দেশ কারেন্সি ডিভাল্যু করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হতে চায় না।’ 

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের স্পেসিফিক খাতে আমরা প্রণোদনা দিবো। তাহলে ওই খাতটি বেগবান হবে। তেমনিভাবে রফতানি বাণিজ্যে বাড়াতে আমরা তৈরি পোশাক খাতকে প্রণোদনা দিয়েছি। আরও দিতে হলে দিবো।’
তিনি বলেন, ‘এটা বার বার বলা হয় কারেন্সি ডিভাল্যু কেন করা হচ্ছে না? আমরা মনে করি কারেন্সি ডিভাল্যু করলে আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ হবে। কারণ আমরা এত পরিমাণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছি, এখন অবকাঠামোতে বিনিয়োগে আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আশা করছি। কারেন্সি ডিভাল্যু করা হলে এ খাতে বিনিয়োগ আসবে না।’ 

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আজকেও একটি পত্রিকায় দেখলাম পুঁজিবাজার থেকে সব বিদেশিরা বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা ধারণা করছে এখানে কারেন্সি ডেভিলিউ করা হবে। কিন্তু আমাদের সরকারের কারেন্সি ডিভাল্যুশন করার কোনো পরিকল্পনা নেই এবং চলতি বাজেটে এটি ছিলনা, আগামী বজেটেও এ ধরণের কোনো সিদ্ধান্ত থাকবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশটা হচ্ছে আমদানি নির্ভরশীল। তাই আমাদের দেশে কারেন্সি ডিভাল্যু করলে ক্ষতি হবে। আমরা যতই কারেন্সি ডিভাল্যু করি না কেনো আমাদের আমদানির তুলনায় রফতানি বাড়বে না। তাহলে কারেন্সি ডিভাল্যু করে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবো কেনো?‘
তিনি বলেন, ‘যদি কোনো নির্দিষ্ট খাত যেমন প্লাস্টিক, সিরামিক এসব খাতে প্রনোদাণা লাগে তাহলে আমরা প্রনোদনা দিবো। ‘

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন যে পুঁজিবাজারের সুচক নিম্নমুখী হচ্ছে এটাও একটি রিউমার। পুঁজিবাজারে একাকটা রিউমার আসে, এটা বহু দিন চলে। তবে আবার স্টেবল হয়, এবার এর রিউমার কয়দিন পর স্টেবল হবে জানিনা।’

তিনি বলেন, আর একটা রিউমার হচ্ছে যে, সরকার ব্যাংকগুলো খালি করে ফেলছে। সরকার সব টাকা ব্যাংক থেকে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার সব টাকা ব্যাংক থেকে নিবে কেন। আমরা আগে টাকা নিতাম দুই সোর্স থেকে এর মধ্যে মেইন সোর্স ছিলো সঞ্চয়পত্র।’

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে সবচেয়ে নিম্নমানের টুলস হচ্ছে সেভিংস ইনন্সুইমেন্ট। আমরা সঞ্চয়পত্রের বিপক্ষে নয়। তবে যাদের জন্য সঞ্চয়পত্র নিয়ে আসা হলেছিলো- আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা পেনশন দেয়ার। তাদের ক্ষেত্রে আমরা হাত দেয়নি। কখনো কাদের বেনিফিট কাটা হবে না। কিন্তু এদের নাম করে ধনী সম্প্রদায় যদি সঞ্চয়পত্র কিনে আমাদের বিপদে সেটা আমরা কেনো মানবো। এরাতো ব্যবসা করে বড় লোক হয়। আমরা কেনো তাদেরকে বেশি সুদ দিবো।’ 

সেজন্য আমরা সঞ্চয়পত্র যাদের জন্য চালু করেছিলাম তাদের জন্যই রাখবো। তাই আগে যারা এখানে বিনিয়োগ করতেন তারা এখন ব্যাংকে টাকা রাখবেন। টাকা ব্যাংকে রাখলে এ ব্যবহারটা বাড়ে। টাকা যদি সঞ্চয়পত্র রাখা হয় সেটা বালিশে টাকা রাখার মতো হয়। অর্থনীতিতে এর তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। কিন্তু এসব টাকা ব্যাংকে রাখলে অন্তত ডেইলি দশ হাত ট্রান্সজেকশন হতো। তাহলে এ টাকা অনেক বেগবান হতো। 

অর্থমন্ত্রী বলেন,  ‘এখন বলা হচ্ছে আমরা ব্যাংক থেকে অনেক টাকা ধার করছি, বাজেটে যে পরিমাণ টাকার ধার করার কথা তার বেশি ধার করা হচ্ছে এবং আসলে আগে আমরা টাকা বেশি নিতাম সঞ্চয়পত্র থেকে তারপর প্রয়োজন হলে নিতাম ব্যাংক থেকে। এবার হয়েছে উল্টো বেশি টাকা নিচ্ছি ব্যাংক থেকে আর সঞ্চয়পত্র থেকে নিচ্ছি কম টাকা। যেহেতু স্ঞ্চয়পত্রে কম টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, সঞ্চয়পত্রের সেই টাকা আবার চলে আসছে ব্যাংকিং খাতে। ’

আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ব্যাংকগুলোতে সুদের হার এক অঙ্ক (১০ শতাংশের নিচে) কার্যকর হচ্ছে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তারা বলছে সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসতে হবে। যারা ভালো ঋণগ্রহিতা তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করতে এ প্রচেষ্টা, তারা টাকা নিয়ে টাকা শোধ করেনি তাদের জন্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সিঙ্গেল ডিজিট ঠিক থাকবে। তবে জানুয়ারি ১ তারিখ থেকেই হবে, এর মধ্যে আশা করি বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করবে এবং ইস্যু করলেই সবাই তো রেডি, ইস্যু করলেই কাজ শুরু করতে পারবে। শুরু করলেই ফলাফল দেখতে পারবে।

জানুয়ারির ১ থেকেই সিঙ্গেল ডিজিট কার্যকর হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে চেষ্টা করছি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে করতে হয়। আক্ষরিক অর্থে হবে… পরে দেখা যাবে ৭ দিন পর হলো। এর মাঝে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করবে এবং সবাই তো রেডি। এ লক্ষ্যে গত ১ ডিসেম্বর সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কৌশল ঠিক করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক রিপোর্ট তৈরি করেছে, সার্কুলার ইস্যু করেনি এবং তাদের একটি কমিটি করে দিয়েছিলাম, সেই কমিটি কাজ শেষ করেছে। ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার চেষ্টা করছি, সে কারণে তারা একটি প্রজ্ঞাপন ইস্যু করবেন। সে প্রজ্ঞাপনে সব কিছু থাকবে, আমাদের মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কাজ করতে হবে।

স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে কয়েক দফা বসে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিটি যে সুপারিশ করেছে যেহেতু সেটা পাবলিক হয়নি, পাবলিক হলে জানতে পারবেন, গোপন রাখবো না কিছু। সারা বিশ্বে কোথাও এত হাই রেটে ইন্টারেস্ট নেই, সামঞ্জস্য করে চলতে হবে।

সুদের হার সবার জন্য এক হবে কিনা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২ শতাংশ দিয়ে যারা রেজিস্ট্রেশন করছে তাদের জন্য এক রকম আবার যারা ভালো তাদের জন্য আলাদা প্রক্রিয়া থাকবে। যারা ঋণখেলাপি তাদের বলা হতে পারে তোমরা অর্ধেক টাকা দিয়ে স্বাভাবিক হও।

সরকারের আমানত ৪০ শতাংশ ব্যাংকগুলোতে দেবে বলে আগেই সিদ্ধান্ত রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন এটা বাড়ানো হবে কিনা আবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গিয়ে দেখবো ৫০ শতাংশ করা যায় কিনা।

বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী মহলের দাবি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। গত অগাস্টে ঋণ ও আমানতের সুদহার যথাক্রমে ৯ ও ৬ শতাংশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে তাগাদা দেওয়া হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো এখন ছয় থেকে থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত সংগ্রহ করছে এবং ঋণের শ্রেণিভেদে সাড়ে ৯ সাড়ে ২০ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে।

আরকে//

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close