Home Economy ঔষধ শিল্প এক অপার সম্ভাবনার নাম

ঔষধ শিল্প এক অপার সম্ভাবনার নাম

267
0

স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পরেই বাংলাদেশে ঔষধ উৎপাদন শুরু হয়। তখন আমরা মাত্র আমাদের চাহিদার ২০ ভাগ ঔষধ উৎপাদন করতে সক্ষম ছিলাম শুরুর দিকে আমদের ঔষধ এর জন্য নির্ভর করতে হত পশ্চিম পাকিস্তানের উপর। যখন বাংলাদেশে ঔষধের তীব্র সংকট ছিল তখন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নামি দামি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গুলো বাংলাদেশকে নানা অযুহাতে ঔষধ বিক্রিতে অনীহা দেখায়। এক পর্যায়ে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে ঔষধ বিক্রি করতে রাজি হয় ইউরোপের হাঙ্গেরির ঔষধ সংস্থা ইগিস, গেইডেন, রিকটার, কাইরন ও মেডিম্পেস। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের প্রায় ৭০ ভাগ বাজার আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর একচোটিয়া দখলে ছিল। ১৯৮২ সালে ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর বিদেশি ঔষধ কোম্পানিগুলোর একচোটিয়া বাণিজ্য থেকে দেশীয় ঔষধ শিল্প মুক্তি পায় এবং আস্তে আস্তে বাজার সম্প্রসারন শুরু করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৯ টিরও বেশী ছোট-বড় ঔষধ কাঔষানা রয়েছে, এর মধ্যে ১৬৪টি কাঔষানা নিয়মিতভাবে ঔষধ উৎপাদন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে এই তথ্যটি পাওয়া যায়। এই ২৬৯টি এ্যালোপ্যাথিক ঔষধ প্রস্ততকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে বছরে ২৪ হাজার রকমের ১২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার ঔষধ ও ঔষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করে। ২০০১ সালে বাংলাদেশে ঔষধ কারখানার সংখ্যা ছিল ১৫০টি। মাত্র ২০ বছরে ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুন।

বর্তমানে দেশের ঔষধ কাঔষানাগুলো ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করছে। যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের প্রায় আরও ১৪৫ টি দেশ বাংলাদেশের ঔষধ ব্যাবহার করছে এবং ঔষধ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি গড়ে ১৫ শতাংশ। কিছু পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ঔষধ শিল্পে রপ্তানি আয় ছিল ৬০ মিলিয়ন ডলার, এর পরের ১ বছর অর্থাৎ ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে এই আয় আরও ১০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে হয় ৭০ মিলিয়ন ডলার,২০১৪-২০১৫ অর্থ বছর ৭৩ মিলিয়ন ডলার, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর ১১ মিলিয়ন ডলার বেড়ে হয় ৮২ মিলিয়ন ডলার, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ৯৫ মিলিয়ন ডলার, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় হয় ৯৬ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার। মাত্র ৮ বছরে ঔষধ শিল্প হতে আয় বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার। এমন ভাবে যদি আয় বাড়তে থাকে তাহলে আশা করা যায় ২০২১ সালের মধ্যে ঔষধ খাত থেকে বাংলাদেশের মোট আয় হবে ৫ বিলিয়ন ডলার। এই আয় ২০২৫ সালের মধ্যে এ আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নিত করতে সরকার এবং এ খাতের বিনিয়োগকারীরা কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৫ সালকে লক্ষ্য করে এগুচ্ছে সরকার এজন্য ইতমধ্যে ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের বাজেটে ঔষধ শিল্পকে বিশেষ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে এর পাশাপাশি ঔষধ রপ্তানিতে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দিচ্ছে সরকার যা মোট শুল্কের ২০ শতাংশ। ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইনটেলেকচ্যুয়াল প্রোপার্টি রাইটস (ট্রিপস) চুক্তি বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের ক্ষেত্রে নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। এই চুক্তির কারণে উন্নত দেশগুলিতে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত সহজে ঔষধ রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ। এখন আমদের লক্ষ্য হল বিশ্ববাজারে ১০ শতাংশ জেনেরিক মার্কেট ধরা এবং এই লক্ষে নিরন্তন পরিশ্রম করে চলেছে ঔষধ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে আমাদের দেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন প্রাপ্ত অন্ততঃ ৫/৭ টি কোম্পানি রয়েছে এবং এই সংখ্যা খুব দ্রুত ২০ এ পৌছাবে। সরকার দেশের ঔষধ শিল্পের বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে যার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এই পরিকল্পনার আওতায় মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় প্রধমবারের মত ঔষধ শিল্পের ৪২টি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিকালস ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) পার্ক গড়ে উঠছে যা শুধুমাত্র যে ঔষধ শিল্পের বিকাশ ঘটাবে তা নয় একই সাথে কর্মসংস্থান ঘটাবে হাজারো মানুষের। আমাদের দেশের উৎপাদিত ঔষধ গুলির বেশির ভাগ ঔষধের কাঁচামাল আমদানী করা হয় বিদেশ থেকে এবং বর্তমানে আমদানীকৃত কাঁচামালের মুল্য প্রতি বছর চার হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যদি সব কাঁচামাল দেশে উৎপাদন দেশেই সম্ভব হয় তবে যেমন ঔষধ শিল্পের অপরিমেয় অগ্রগতি সাধিত হবে একই সাথে সকল ঔষধ অঙ্কে কম দামেই উৎপাদন করা সম্ভব হবে একই সাথে দেশের বাজারে কমবে ঔষুধের দাম। উক্ত লক্ষ্য কেই মাথায় রেখে ইতিমধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি প্লট বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। তাইলে আসা করাই যায় এমন একদিন আসবে যেদিন ঔষধ শিল্পের সকল উপাদান দেশেই উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে পাঁচ হাজার ব্র্যান্ডের আট হাজারেও বেশি ঔষধ উৎপাদন হয় যদি ঔষধ শিল্পের সকল কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন সম্ভব হয় তাহলে বলায় যায় যে এই সংখ্যাটা আরও বাড়বে এবং এই কথা বলা যায় যে যদি সব দিক ঠিক থাকে তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পোশাক খাতের মত ঔষধ শিল্প খাতও প্রধান খাতে পরিণত হবে।
সরকার নকল ঔষধ বন্ধের ও পরিকল্পনা গ্রহণ করছে এই পরিকল্পনার আওতায় ১৫০টি গ্রেড-এ ও ২ হাজারটি গ্রেড-বি মডেল ফার্মেসি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যেখেনে গ্রেড-এ ফার্মেসি হবে ১৫ ফুট ঢ১৫ফুট এবং গ্রেড-বি হবে ১০ ফুট ঢ ৯ফুট। এই দুই ধরনের ফার্মাসি খোলা থাকবে ২৪ ঘন্টা। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এমনকি গ্রাম গঞ্জে ও তৈরী হবে এই মডেলের ফার্মাসি যা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিবে গ্রাজুয়েট ও নন-গ্রাজুয়েটসহ ফার্মাসিস্টদের। এই পরিকল্পনার অধীনে লাইসেন্সবিহীন প্রায় ২০ হাজার ফার্মেসিকে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে যেখানে বর্তমানে লাইসেন্স প্রাপ্ত ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ ২১ হাজার। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে লাখো মানুষের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here