web analytics
Technology

অমরত্বের গবেষণায় বিজ্ঞান : চতুর্থ পর্ব – অঙ্গ প্রতিস্থাপন

প্রথম পর্বে ছিল জীবন, মৃত্যু, প্রাণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃত্যুর ধারণা, দ্বিতীয় পর্ব ছিল প্রকৃতিতে অমরত্বের উদাহরণ নিয়ে, তৃতীয় পর্বে ছিল মৃত্যুকে তাড়িয়ে বেড়ানো আবিষ্কার ও গবেষণার আণুবীক্ষণিক দিক ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিবায়োটিক এর সফলতার ইতিহাস। চতুর্থ পর্ব থাকছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শল্য চিকিৎসা (সার্জারি) বিভাগের বৈপ্লবিক আবিষ্কার অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিষয়ে।

চতুর্থ পর্ব

মানুষের দেহের নানাবিধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে কিছু অঙ্গ রয়েছে জীবনের জন্য অপরিহার্য; যেমন হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ইত্যাদি। এগুলো ছাড়া বর্তমান মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। আবার কিছু প্রত্যঙ্গ রয়েছে যেগুলো সুস্থ জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এগুলোর কোনোটির অনুপস্থিতি প্রাণসংশয়কারী নয়; যেমন আংশিক হাত, আংশিক পা, আঙুল, ইত্যাদি। একটা সময় ছিল যখন অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কোনো একটির রোগাক্রান্ত হয়ে কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল অবধারিত মৃত্যু। কিন্তু বর্তমান উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা অতীতের কিছু কিছু ‘অবধারিত মৃত্যু’র পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে অঙ্গ প্রতিস্থাপন নামক চিকিৎসা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ১৮৬৯ সালে সফল স্কিন গ্রাফটিং এর মধ্য দিয়ে শল্য চিকিৎসায় দেহাংশ প্রতিস্থাপনের নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটে যা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৬ সালে কর্নিয়া’র মত সূক্ষ্ম ও জটিল দেহাংশের সফল প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট ব্যবস্থায় প্রাথমিক বিপ্লব ঘটায়। বিগত এক শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেক ধরণের অঙ্গ প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন এখন অনেক অগ্রগামী। শুধু সদ্যমৃত দেহ থেকেই নয় বরং বর্তমানে জীবিত মানুষের দেহ থেকেও সুস্থ অঙ্গ নিয়ে (অবশ্যইঅঙ্গ দাতার অনুমতি সাপেক্ষে ও জীবন সংশয় না ঘটিয়ে) তা মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করে তাঁকে দেয়া হচ্ছে নতুন জীবন।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পরিসর বর্তমানে অত্যন্ত ব্যাপক। দেহের আংশিক থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। সম্পূর্ণ অঙ্গের মধ্যে এখন পর্যন্ত সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, প্যানক্রিয়াস (অগ্নাশয়) ও ইনটেসটিনি (নাড়ীভুঁড়ি)। এক্ষেত্রে জীবিত দাতার নিকট থেকে দাতার সুস্থতা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ একটি কিডনি ও একটি ফুসফুস, আংশিক লিভার, প্যানক্রিয়াস ও ইনটেসটিনি নেয়া যায়। অন্যান্য অঙ্গগুলো শুধুমাত্র মৃত দাতার কাছ থেকে নেয়া সম্ভব। আংশিক অঙ্গ বা দেহাংশ প্রতিস্থাপনে এখন পর্যন্ত সফলতার তালিকায় রয়েছে চোখের কর্নিয়া, লিভার, প্যানক্রিয়াস ও ইনটেসটিনির অংশবিশেষ।

টিস্যু বা দেহকলার মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে চামড়া, হাড়, হৃদ-কপাটিকা (Heart Valve), হাড় ও পেশির সংযুক্তকারী টেন্ডন। দেহকলা সাধারণত সদ্যমৃত ব্যক্তির দেহ থেকে মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ করতে হয়। সংগ্রহের পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিস্থাপনের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। অতি সম্প্রতি ২০০৫ সালে পূর্ণাঙ্গ মুখমণ্ডল এবং ২০১৪ সালে বাহু (হাত) প্রতিস্থাপনে সফলতা অর্জন করেছেন চিকিৎসকগণ।

কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পর থেকে মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন পর্যন্ত শতবছরে শল্য চিকিৎসার উৎকর্ষে প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এর মধ্যে দুটি অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিডনি ও হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট। পৃথিবীতে অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারির এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয় কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট। আর হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট এর উল্লেখযোগ্যতা বলাই বাহুল্য। কারণ এটি সরাসরি ‘কার্ডিয়াক ডেথ’ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

কিডনি প্রতিস্থাপন

১৯৫৪ সালে প্রথমবারের মত সফল কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়। এ কাজের জন্য সার্জন Joseph E. Murray ১৯৯০ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

মানুষের দুটো কিডনি থাকে। কিডনি রক্ত থেকে ছেঁকে দূষিত অপদ্রব্য মূত্র আকারে নিষ্কাশনের কাজ করে। কোনো কারণে একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু দুটি কিডনিই যদি একই সাথে কার্যকারিতা হারায় তখন দেহের বর্জ্য নিষ্কাশিত হয় না। ফলে এসব দূষিত পদার্থ যেগুলো দেহের বাইরে বেরিয়ে যাবার কথা সেগুলো সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে, যা রোগীর জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। সেক্ষেত্রে রোগীর জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন হয় কমপক্ষে একটি সুস্থ কিডনি। কিন্তু চাইলেই তো সার্জারি সম্ভব নয়, আগে চাই রোগীর সাথে মিলবে এমন কোন কিডনি। বর্তমান বিশ্বে সর্বোচ্চ সংখ্যক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি হয় কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট। World Health Organization  (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ২০০৫ সালেই পৃথিবীর ৯১টি দেশে মোট ৬৬,০০০ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সংঘটিত হয়েছে।

বর্তমানে পৃথিবীতে চাহিদার তুলনায় প্রতিস্থাপনযোগ্য কিডনির যোগান কম। তাই রোগীকে একটি কিডনি পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। কিন্তু অকার্যকর কিডনি নিয়ে একজন মানুষের পক্ষে বেশিদিন বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট এর জন্য অপেক্ষারত সময়টাতে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ অপসারণ করা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। এই কাজটিই করা হয় ‘ডায়ালাইসিস’ এর মাধ্যমে। ডায়ালাইসিস মেশিনের ভেতর দিয়ে রক্ত পাম্প করে পাঠিয়ে তা আবার রোগীর দেহে প্রবেশ করানো হয়। কিডনি রক্ত ছাঁকার যে কাজটি করত এক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস মেশিন সে কাজটি করে থাকে। মেশিন রক্ত ছেঁকে অপদ্রব্য আলাদা করে পরিশুদ্ধ রক্ত রোগীর দেহে ফেরত পাঠায়। প্রতিস্থাপনযোগ্য সুস্থ কিডনি পাবার পূর্ব পর্যন্ত রোগীকে এই ব্যবস্থায় বাঁচিয়ে রাখা হয়।

হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন

হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন পদ্ধতির আবিষ্কর্তা হিসেবে ও আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে এই সার্জারির একচ্ছত্র আধিপত্যে যার নাম স্মরণ করতে হয় তিনি হচ্ছেন সাউথ আফ্রিকান কার্ডিয়াক সার্জন Dr. Chris. Barnard.

১৯৬৭ সালের ৩ ডিসেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় সদ্যমৃত (Brain Dead) এক নারীর হৃদপিণ্ড নিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় ৫৩ বছর বয়সী হৃদরোগে আক্রান্ত (coronary insufficiency) এক রোগীর দেহে। এটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি। Dr. Chris. Barnard ছিলেন সেই সার্জারি টিমের নেতৃত্বে। এই সার্জারির পর প্রতিস্থাপিত হৃদপিণ্ড নিয়ে রোগী ১৮ দিন বেঁচে ছিলেন। তারপর সার্জারি পরবর্তী জটিলতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারির মাসখানেক পরেই ১৯৬৮ সালের ২ জানুয়ারি Dr. Chris. Barnard তাঁর ও ইতিহাসের দ্বিতীয় হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সম্পন্ন করেন। এবার হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা হয় ৫৯ বছর বয়সী একজন দন্তচিকিৎসকের দেহে। এটিকে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারির প্রথম সফল সার্জারি বলা যেতে পারে। সার্জারির পর প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্র নিয়ে প্রথমবারের মত হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারির কোনো রোগী সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল ত্যাগ করেন। সার্জারির ১৯ মাস পর প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্রে করোনারি আর্টারি ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।

১৯৭৪ সাল পর্যন্ত Dr. Chris. Barnard তাঁর চিকিৎসক দল নিয়ে আরো দশটি হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সম্পন্ন করেন। রোগীদের মধ্যে চারজন ১৮ মাসেরও বেশি সময় প্রতিস্থাপিত হৃদযন্ত্র নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এদের মধ্যে দুজন রোগী হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের পর যথাক্রমে ১৩ বছর ও ২৩ বছর বেঁচে ছিলেন। এসময় হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি মানে ছিল আক্ষরিক অর্থেই প্রতিস্থাপন। একে বলা হয় Orthotopic heart transplantation. এক্ষেত্রে রোগীর পুরনো হৃদযন্ত্র ফেলে দিয়ে ডোনারের হৃদযন্ত্র সেখানে বসিয়ে দেয়া। কিন্তু ১৯৭৩ সালের একটি সার্জারির বিফলতা হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি পদ্ধতিতে নতুন ধারা নিয়ে হাজির হল। একজন রোগীর দেহে নতুন হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করার পর প্রতিস্থাপিত হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হতে ব্যর্থ হওয়ায় রোগী অপারেশন থিয়েটারেই মৃত্যুবরণ করে। পরবর্তীতে Dr. Chris. Barnard তাঁর সার্জন টিম নিয়ে গবেষণা করেন কিভাবে এই ঝুঁকি কমানো যায়। তখন তিনি ধারণা দেন হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন না করে অসুস্থ হৃদপিণ্ডকে সহায়তা করার জন্য অতিরিক্ত একটি হৃদপিণ্ড সংযোজন করা যেতে পারে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে Heterotopic heart transplantation পদ্ধতি। কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই পদ্ধতিটিই অধিক সমাদৃত। এ প্রক্রিয়ায় রোগীর অসুস্থ হৃদযন্ত্র যথাস্থানে সচল রেখেই বুকের ডানদিকে আরেকটি হৃদপিণ্ড স্থাপন করা হয় যেটি অন্যটির সাথে একই সাথে সচল থাকে। কোনো কারণে সার্জারির পর সংযোজিত হৃদপিণ্ড স্বাভাবিক কার্যক্রমে বার্থ হলেও সাথে সাথে রোগী মৃত্যুবরণ করে না বরং ‘রি-ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’ করার সুযোগ থাকে।

১৯৭৪ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ৪৯ টি Heterotopic heart transplantation সার্জারি করেছেন Dr. Chris. Barnard. সার্জারির প্রথম পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই দুটি হৃদপিণ্ড নিয়ে ১০ বছরের বেশি সুস্থ অবস্থায় বেঁচে ছিলেন।

১৯৭৭ সালে Dr. Chris. Barnard ডোনার না পেয়ে দুজন সংকটাপন্ন রোগীর দেহে যথাক্রমে বেবুন ও শিম্পাজীর হৃদপিণ্ড সংযোজন করেন। একে বলা হয় Xenotransplantation. বেবুনের হৃদপিণ্ডের রক্তসঞ্চালনের পরিমাণ কম হওয়ায় রোগী সার্জারির চার ঘণ্টা পর মারা যায়। অন্যদিকে সার্জারির চারদিন পর শিম্পাঞ্জীর হৃদপিণ্ড প্রত্যাখ্যান করায় অপর রোগী মারা যায়। পরবর্তীতে মানুষের উপর এই সার্জারি করা বন্ধ হয়। এখন মানবদেহে অন্য প্রাণীর হৃদপিণ্ড সংযোজনের প্রক্রিয়াটিতে সফলতার জন্য গবেষণা চলছে গবেষণাগারের গণ্ডির ভেতরেই।

পূর্বে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি সম্পন্ন হত পাশাপাশি দুটি অপারেশন থিয়েটারে। সদ্যমৃত (Brain Dead) ডোনারের হৃদপিণ্ড এনে সাথে সাথে স্থাপন করা হয় রোগীর দেহে। বর্তমানে ডোনার হৃদপিণ্ড সঠিক সময়ে মৃতদেহ থেকে অপসারণ করতে পারলে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হৃদপিণ্ড ‘জীবিত’ রাখা যায়। এতে দূরবর্তী কোথাও দাতা পাওয়া গেলেও সেই হৃদপিণ্ড ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

সফল হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন পরবর্তীকালে এ নিয়ে ধর্মবেত্তাগণ যথেষ্ট নাখোশ ছিল এবং একে ‘ঈশ্বরের ডিজাইনে হস্তক্ষেপ’ বলে তিরস্কার করেছে। এই তিরস্কারের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তথাকথিত আত্মার ধারণা। তথাকথিত আত্মার একটি বিশেষ আশ্রয়স্থল ছিল হৃদপিণ্ড। সফল হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের পর রোগীর দেহে ‘কার আত্মা’ বিরাজ করছে? দুটি হৃদপিণ্ড নিয়ে যে বেঁচে আছে তার কী দুটি আত্মা? একাধিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারির মধ্য দিয়ে গেলে সে ব্যক্তি এক জীবন কয়টি আত্মা বহন করলো? ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ‘আত্মা’ হৃদপিণ্ড থেকে উৎখাত হতে বাধ্য হয়েছে।

মাথা প্রতিস্থাপন

অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট এর পরিসরে হয়ত শীঘ্রই যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘মাথা’। সম্প্রতি ইটালিয়ান সার্জন Dr. Sergio Canavero এই ধরনের সার্জারি করা যে সম্ভব, তার ঘোষণা দিয়েছেন। এই শল্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে একজনের মাথা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে আরেকজনের শরীরে।

হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট বলা হলেও মূলত এখানে ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে মাথা নয় বরং পুরো শরীর। কারণ যার মাথা আসলে তিনিই বেঁচে থাকছেন আরেকজনের সম্পূর্ণ একটি শরীর নিয়ে। এখানে দাতা হবেন একজন ব্রেইনডেড মানুষ, যিনি মারা গেছেন তার মস্তিষ্ক কার্যকারিতা বন্ধ করে দেয়ার দরুন কিন্তু তার শরীরের অন্যান্য অংশ কার্যকর; আর গ্রহীতা হবেন এমন একজন মানুষ যার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ঠিক আছে কিন্তু তিনি কোন জটিল শারীরিক রোগাক্রান্ত, যার জন্য তার জীবন সংকটাপন্ন।

১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম Head transplant এর একটি পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছিল একটি বানরের উপর। তবে সেসময় স্পাইনাল কর্ড প্রতিস্থাপনের মত প্রযুক্তি না থাকায় বানরের স্পাইনাল কর্ড সঠিকভাবে সংযুক্ত করা যায়নি। ফলাফল হিসাবে বানরটি শরীর নড়াচড়া করতে পারেনি এবং অস্ত্রোপচারের ৮ দিন পর মারা যায়। তবে এখন স্পাইনাল কর্ড প্রতিস্থাপনের মত প্রযুক্তি রয়েছে চিকিৎসকদের হাতে, যার দরুণ এমন একটি অস্ত্রোপচারে উদ্যোগী হয়েছেন Dr. Sergio Canavero.

(শুধু হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট নিয়েই একটি পৃথক আর্টিকেল আছে বিজ্ঞানযাত্রায়)

Dr. Sergio Canavero এই অস্ত্রোপচারকে মানুষের অমরত্বের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই অস্ত্রোপচার সফল হলে, একদিকে যেমন জীবনের জন্য আত্মার বিষয়টি আরো অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে যেমনটা একবার হয়েছে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন সফল হবার পর, তেমনি শুধু মাথাকে বাঁচিয়ে রাখা মানেই একজন মানুষের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে পারা এই ধারণার প্রসার ঘটবে।

এক্ষেত্রে একজন কার্ডিয়াক ডেড ব্যক্তির মাথা দ্রুততার সাথে সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে কোনো ব্রেইনডেড ডোনারের দেহে সংযুক্ত করার মাধ্যমে হয়ত মৃত ব্যক্তিকে আবার বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়ে উঠতেও পারে সুদূর ভবিষ্যতে; চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে।

এছাড়া বর্তমানে ক্লোনিং একটি সফল ও কার্যকরী পদ্ধতি। ক্লোনের সফলতার কথা বলতে গেলে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে ক্লোন ভেড়া ‘ডলি’ ও কয়েক বছর পরেই এই শতকের শুরুতেই ক্লোন ইঁদুর ‘র‍্যালফ’ এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হলে, ব্রেইন ডেড ডোনারের জন্য অপেক্ষা না করে কোন একজন ব্যক্তির দেহকোষ দিয়ে ক্লোনিং এর মাধ্যমে আরেকজন ‘তাঁকে’ তৈরি করা হবে তারপর নতুন ‘তাঁর’ মাথার স্থানে বর্তমান মাথাটি প্রতিস্থাপন করা হবে। এতে মানুষটি তার ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি, আমিত্বসহই একটি নতুন দেহ পাবে। বলা যেতে পারে প্রতিবার ক্লোনিং ও হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট তাঁকে দিচ্ছে এক একটি নতুন জীবন। এই সামগ্রিক ব্যবস্থাটি সম্ভব হলে এটিকে অন্তত মানুষের ‘স্নায়বিক অমরত্ব’ বলা যেতেই পারে।


তবে ক্লোনিং করে আয়ুষ্কাল বাড়ানোর এই পদ্ধতি কতটা ‘মানবিক’ হবে নতুন ‘তাঁর’ জন্য এবং এই পদ্ধতিকে চিকিৎসার নৈতিকতা বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া উচিৎ হবে কিনা তা নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে। ক্লোনিং ও জিন প্রকৌশল নিয়ে থাকবে পরবর্তীতে সিরিজের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্ব। সেই পর্বে এবং সিরিজের শেষ পর্বে অমরত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির নৈতিকতার প্রশ্নগুলো উঠে আসবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close